অনাস্থার মুখে উদয়ন স্কুলের যৌন হয়রানির তদন্ত কমিটি থেকে ঢাবির ২ প্রক্টরের পদত্যাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর। শিক্ষার্থীদের অনাস্থা প্রকাশের মুখে মঙ্গলবার বিকেলে তারা প্যানেল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি নতুন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অনাস্থা ও তদন্তকারীদের বক্তব্য

তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ও ঢাবির সহকারী প্রক্টর ড. এনামুল হক সজীব জানান, তাদের তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তবে শিক্ষার্থীরা অনুলিপি জমা দেওয়ার আগেই প্যানেলের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “পূজার ছুটির প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে আমরা কাজটি শুরু করি। প্রথমে উভয় পক্ষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও একজন শিক্ষার্থী আরও পাঁচজনের নাম উল্লেখ করায় পরিধি বেড়ে যায়। ফলে প্রতিবেদন তৈরিতে কিছুটা বাড়তি সময় লেগেছিল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “মঙ্গলবারই হয়তো আমরা রিপোর্ট জমা দিতাম। কিন্তু সোমবার শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে অধ্যক্ষকে জানায় যে এই কমিটির ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। যাদের বিশ্বাস নেই, তারা তদন্ত প্রতিবেদনও মেনে নেবে না। তাই আমি ও অপর সহকারী প্রক্টর প্যানেল থেকে সরে দাঁড়িয়ে অধ্যক্ষের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।”

কমিটির আহ্বায়ক মো. আবুল হোসেন বেপারী জানিয়েছেন, তাদের তদন্ত কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে অনাস্থার কারণে তারা প্রতিবেদন জমা দেননি। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মিলে নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।

যেভাবে সামনে এলো যৌন হয়রানির অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নবম শ্রেণির এক ছাত্র বেশ কয়েকজন সহপাঠীকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানি করে আসছিল। সম্প্রতি সে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেয়েদের ছবি বিকৃত ও আপত্তিকর রূপ দিয়ে ছড়িয়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রথমে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে গত ৭ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা এবং ঢাবির দুই সহকারী প্রক্টর স্কুলে আসেন। পরদিন ৮ অক্টোবর ১০ জন শিক্ষার্থীকে পৃথক কক্ষে ডেকে নিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে লিখিত বক্তব্য আদায় করা হয়। এ সময় ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ থাকা একটি মোবাইল ফোনও তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা জানায়, আন্দোলন শুরু করার পর থেকে দুর্গাপূজার ছুটিসহ টানা ২৫ দিনের বেশি সময় ধরে তারা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে বঞ্চিত। প্রথমে তাদের ক্লাস ও পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি। অভিভাবকদের প্রতিবাদের পর আলাদা কক্ষে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হলেও স্বাভাবিক ক্লাসে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। উপরন্তু, আন্দোলন চালিয়ে গেলে টিসি (ছাড়পত্র) দিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

স্বার্থের সংঘাত ও নতুন কমিটির আশ্বাস

তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার প্রধান কারণ ছিল অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পরিবার। অভিযুক্ত ছাত্রের বাবা ঢাবির বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন। অথচ তদন্ত কমিটিতে ঢাবির যে দুজন সহকারী প্রক্টরকে রাখা হয়েছিল, তারাও একই অনুষদের শিক্ষক।

এ বিষয়ে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান স্বীকার করেন, শিক্ষকদের অনুষদের বিষয়টি তার মাথায় আসেনি। তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষকদের দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করানোর উদ্দেশ্যেই তাদের যুক্ত করা হয়েছিল। অনুষদের বিষয়টি খেয়াল না করা একটি ভুল ছিল।”

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিশ্চিত করেছেন যে পদত্যাগ করা দুই শিক্ষকের স্থলে অন্য অনুষদের নিরপেক্ষ শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুতই একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

Views: 0