ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তোপ তেহরানের: আমেরিকার সাথে নতুন যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সামরিক হুমকির জবাবে তেহরান সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা আগের চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে এবং তা কখন থামবে তা আমেরিকা ঠিক করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে কোনো সংঘাত শুরু হলে তা আগের যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে পুনরায় হামলার ইঙ্গিতের পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর প্রতিক্রিয়া এলো।

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, দেশটির সেনাপ্রধানের প্রতিনিধি মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, “ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তার স্থায়িত্ব আগের সংঘাতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সেই সংঘাত কখন বা কী শর্তে শেষ হবে, তা নির্ধারণ করার অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন না।”

ট্রাম্পের হুমকি ও সামরিক উত্তেজনা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান জুড়ে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই অঞ্চলের সংঘাতের তীব্র পর্যায় শুরু হয়। জবাবে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং লেবানন ও ইয়েমেনে তেহরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের বাকি থাকা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে দ্রুত আঘাত হানা সম্ভব। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমাদের এখনও হয়তো এক বা দুটি স্থানে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে, যা ১০ মিনিটের মধ্যেই করা সম্ভব।” তিনি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, খুব দ্রুত সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তীতে আইওয়াতে এক নির্বাচনী সভায় তিনি তেহরানকে কঠোর বার্তা দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

নেতানিয়াহু-ট্রাম্প ফোনালাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ইরানের ওপর যুদ্ধ অভিযান জোরদারের সময়সীমা নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপ করেছেন ট্রাম্প। এক্সিওস (Axios) জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে হামলার জন্য চাপ দেন নেতানিয়াহু, যদিও ট্রাম্প আলোচনার সুযোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। এই আলোচনাকে ইসরায়েলি সূত্র ‘কঠিন’ এবং মার্কিন সূত্র ‘সরাসরি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তেহরানের সর্বাত্মক অবস্থান ও যুদ্ধের শর্ত

ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা নতুন কোনো হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। রিভোল্যুশনারি গার্ডসের মুখপাত্র হোসেইন মহেব্বি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির বার্তার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, “আমেরিকার সাথে সংঘাতের ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না; শত্রুর ক্ষতি করার জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।”

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আববাস আরাঘচি বলেন, “আমরা আশা করি অপর পক্ষ প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে এবং কূটনীতির পথ বেছে নেবে।” তিনি জানান, ইরান আত্মরক্ষা ও কূটনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

জেডি ভ্যান্সের চিঠি ও হরমুজ প্রণালী

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাই জানান, আলোচনা পুনরায় চালু করার প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে তিনি একটি চিঠি পেয়েছেন। আমেরিকার বার্তায় ইতিবাচক সুর লক্ষ করলেও তেহরান এখনও কোনো জবাব দেয়নি। রেজাই উল্লেখ করেন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, বন্দরে অবরোধ প্রত্যাহার, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালী খোলা বা আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও জনজীবন

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ জানান, অঞ্চলটি নতুন কোনো সংঘাত চায় না, তবে যেকোনো খারাপ পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে।

এদিকে তেহরানের বাসিন্দাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ২৭ বছর বয়সী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মহাদেসে চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ৪৮ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ইব্রাহিম বলেন, “আমরা নতুন কোনো যুদ্ধকে ভয় পাই না, কারণ আমরা প্রায় ৪৮ বছর ধরে যুদ্ধের মধ্যেই বসবাস করছি।”

Views: 0