ভারতে চলমান বৈষম্য ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দেশকে নতুন দিশা দেখাতে অনেক নাগরিকই এখন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ওপর আস্থা রাখছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট যখন ঘনীভূত, সমাজে ধনী-দরিদ্র ব্যবধান যখন চরম রূপ নিয়েছে, ঠিক তখন বিরোধীদের বিশাল সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি নতুন বার্তা দিচ্ছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে তরুণেরা যখন ক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নামছেন, তখন রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গণতন্ত্রের সংকট ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
গণতান্ত্রিক মূলবোধের অবক্ষয় কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সখ্যতার মধ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রতি উদাসীনতা প্রকাশ পায়। অভিযোগ রয়েছে, পেগাসাস আড়িপাতার প্রযুক্তির মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিতর্কিত উপায়ে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও উঠেছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে।
ইসরায়েল ও গাজা ইস্যুতে ভারতীয় দলগুলোর সিংহভাগ নীরব থাকলেও, সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রকাশ্যেই এই গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ধর্মীয় উৎসবে ইসরায়েলি কূটনীতিককে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ক্ষমতার মোহ নাকি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা?
ভারতীয় রাজনীতির বড় একটি প্রশ্ন হলো—রাহুল গান্ধী নিজে কি প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মরিয়া? নেহরু-গান্ধী পরিবারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ক্ষমতার প্রতি তীব্র লোভের প্রমাণ মেলে না।
নেহরুর পদত্যাগের ইচ্ছা ও উত্তরসূরি নির্বাচন
বিজেপি প্রতিনিয়ত জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার লোভি হওয়ার অভিযোগ আনলেও ঐতিহাসিক তথ্য ভিন্ন কথা বলে। নেহরু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে দুবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন:
- ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি: দেশভাগ-পরবর্তী শরণার্থী সংকট তৈরি হলে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের অনুরোধে তা স্থগিত করেন।
- ১৯৫৮ সাল: মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে এবং রাজনীতির নিম্নগামী মান দেখে তিনি আবারও পদ ছাড়তে চান, যদিও দলের অনুরোধে তাঁকে থাকতে হয়।
নেহরু কখনো তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেননি। ১৯৫২ সালে তিনি সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে তাঁর সহযোগী হিসেবে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ডানপন্থী মোরারজি দেশাইয়ের বদলে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে উত্তরসূরি হিসেবে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
ইন্দিরা, রাজীব ও সোনিয়া গান্ধীর ভূমিকা
তাসখন্দে শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর মোরারজি দেশাইকে ঠেকাতেই কংগ্রেসের তৎকালীন সিন্ডিকেট ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে বামপন্থীদের সহযোগিতায় ইন্দিরা দলীয় রক্ষণশীলদের থেকে নিজেকে আলাদা করেন।
রাজীব গান্ধীও স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতিতে আসেননি। ছোট ভাই সঞ্জয় গান্ধীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের মতো বিপর্যয় তাঁকে বাধ্য করেছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে। সোনিয়া গান্ধী রাজীবের রাজনীতিতে যোগদানের বিরুদ্ধে ছিলেন। তবুও রাজীব বলেছিলেন, “আমি তাঁর সন্তান। আমি যদি এই কঠিন সময়ে দায়িত্ব না নিই, তবে কে নেবে?”
একইভাবে ২০০৪ সালে নির্বাচনে জয়ের পর সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে ড. মনমোহন সিংকে দায়িত্ব দেন। তিনি একটি শক্তিশালী পরামর্শক পরিষদ (এনএসি) গঠন করে দারিদ্র্য বিমোচন, তথ্য অধিকার এবং শিক্ষার অধিকারের মতো জনকল্যাণমূলক নীতি প্রণয়নে নজর দিয়েছিলেন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও রাহুলের কৌশল
রাহুল গান্ধী তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার বজায় রেখে এক ধরনের শালীন ও উদার রাজনীতির চর্চা করছেন। তবে বর্তমানের আক্রমণাত্মক ও কঠোর ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিবেশ মোকাবিলায় কেবল শালীনতা কতটুকু কাজে দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রিয়াঙ্ক খাড়গে, এম কে স্ট্যালিন কিংবা অখিলেশ যাদবের মতো মাঠপর্যায়ের লড়াকু নেতাদের তুলনায় রাহুল গান্ধী কতটা শক্ত হাতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবেন, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
