‘বাংলাদেশ সবার আগে’: রাজধানীজুড়ে বিশাল পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিলেন তারেক রহমান

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল পদযাত্রায় হেঁটে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলা সব ধরনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দেশবাসী অতীতে যেভাবে সব চক্রান্ত নস্যাৎ করেছে, এবারও তার উপযুক্ত জবাব দেবে।

ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি

ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, একটি গোষ্ঠী আবারও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে এবং ‘ডামি নির্বাচন’-এর সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চাইছে। তবে ১৯৭১, ১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের মতো এ দেশের জনগণ আবারও তাদের সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, “অতীতের মতোই তারা আজও চক্রান্তে লিপ্ত। তারা আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফের বিপন্ন করতে চায় এবং ‘ডামি নির্বাচন’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে আমরা ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতোই আবারও তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে চাই। আজকের এই পদযাত্রা হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার দিন।”

১৯৭৫ ও ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের ছাত্র-জনতা কেবল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পুনরুজ্জীবিত করেনি, স্বৈরাচারী শক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীদেরও ক্ষমতাচ্যুত করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, “১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যেভাবে চক্রান্তকারীদের পরাজয় হয়েছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জনগণের জোরালো আন্দোলনের মুখে আবারও তাদের পরাজয় ঘটেছে।” তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, যে জাতি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতার বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান এনেছে—তাদের কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

‘বাংলাদেশ সবার আগে’: গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান

গণতন্ত্র রক্ষায় দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আসুন, বাংলাদেশের সব গণতন্ত্রকামী মানুষকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করি। চক্রান্ত দেশের ভেতর থেকে আসুক বা বাইরে থেকে, আমরা সবাই মিলে তার কঠোর জবাব দেব।”

এই ঐতিহাসিক দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর মানেই জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সমাবেশের একপর্যায়ে তিনি স্লোগান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। বাংলাদেশ সবার আগে, সবার জন্য বাংলাদেশ।”

রাজধানীতে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা

সমাবেশের বক্তব্য শেষে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পদযাত্রা শুরু করেন। সাদা হাফ-হাতা শার্ট, ধূসর ট্রাউজার ও নেভি-ব্লু স্নিকার্স পরিহিত প্রধানমন্ত্রী পুরো পথ হেঁটে অতিক্রম করেন।

পদযাত্রার পথসূচি ছিল:

  • নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সূচনা
  • কাকরাইল মোড় ও প্রধান বিচারপতির বাসভবন সংলগ্ন সড়ক
  • রমনা পার্ক এলাকা ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়
  • বাংলামটর, ফার্মগেট ও ইন্দিরা রোড অতিক্রম
  • বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মানিক মিয়া এভিনিউতে সমাপ্তি

দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার পথজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। আশপাশের ভবনের ছাদ ও বারান্দা থেকেও সাধারণ মানুষকে হাত নাড়তে দেখা যায়। তারেক রহমানও হাসি মুখে হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ পদযাত্রাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির সময় যেভাবে দীর্ঘ পথ হাঁটতেন, তারেক রহমানও ঠিক একই শক্তিতে দীর্ঘপথ হেঁটে নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করেছেন।

জনসমুদ্র ও পতাকার মিছিল

শনিবার দুপুর ১২টা থেকেই ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নয়াপল্টনে জড়ো হতে শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়াপল্টন থেকে কাকরাইল ও ফকিরাপুল পর্যন্ত এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

নেতাকর্মীরা জাতীয় পতাকা, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রঙিন ক্যাপ ও টি-শার্ট পরে মিছিলে অংশ নেন।

পদযাত্রায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি ও আহমেদ আযম খান, উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ রশীদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিনটুকু সহ অন্য শীর্ষনেতারা অংশ নেন।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থান শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর তিনি বেশ কিছু জনসভায় বক্তব্য রাখলেও জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই বিশাল পদযাত্রায় হেঁটে অংশ নেওয়া এটিই তার প্রথম কোনো বড় দলীয় রাজপথের কর্মসূচি।

Views: 0