শিক্ষার বাড়তি খরচে পিষ্ট নিম্নবিত্ত পরিবার: বাড়ছে ঝরে পড়া ও শিশুশ্রমের ঝুঁকি

সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পাঠ্যবই পেলেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে প্রতিবছর হাজার হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে অভিভাবকদের। গাইডবই, খাতা, কলম, ইউনিফর্ম, জুতা, যাতায়াত, গৃহশিক্ষক, কোচিং এবং পরীক্ষা ফির বাড়তি বোঝা বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। খরচের লাগাম টানতে না পেরে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সন্তানকে আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে, আবার কেউ কেউ পড়াশোনা বন্ধ করে সন্তানদের শিশুশ্রমে নিয়োজিত করছে।

এডুকেশন ওয়াচ গবেষণায় খরচের ভয়াবহ চিত্র

গণসাক্ষরতা অভিযান (CAMPE) পরিচালিত ‘এডুকেশন ওয়াচ ২০২৩’ সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে একজন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারের গড় বার্ষিক খরচ ছিল ১৩,৮৮২ টাকা। অন্যদিকে, মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যয় হয় ২৭,৩৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিিকের তুলনায় মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারগুলোকে প্রায় দ্বিগুণ টাকা খরচ করতে হয়েছে।

শহরাঞ্চলে এই খরচের মাত্রা ছিল আরও বেশি। ২০২২ সালে শহরে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর গড় বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ১৮,১৩২ টাকা এবং মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তা ছিল ৩৫,৬৬২ টাকা।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা ব্যয় তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় খরচ হয় ৮,৬৪৭ টাকা এবং মাধ্যমিকে ২০,৭১২ টাকা। ২০২২ সালের সঙ্গে তুলনা করে গবেষকরা হিসাব করেছেন যে, বার্ষিক শিক্ষা খরচ প্রাথমিকে ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এই উপাত্তগুলো আগের। এরপর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া ও পরিবহন খরচসহ জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯ শতাংশ। টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, যা শিক্ষার ব্যয় বহন করা আরও কঠিন করে তুলেছে।

সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর প্রাত্যহিক সংগ্রাম

ময়মনসিংহের নন্দাইল উপজেলার উলুহাটি গ্রামের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী মারজিনা খাতুন বর্তমানে ঢাকার মোহাম্মদপুরের নবোদয় বাজার সংলগ্ন সড়ক নম্বর ২-এর একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। স্বামীর একার আয়ে সংসার না চলায় তিনি তিনটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে মাসে প্রায় ৯,০০০ টাকা আয় করেন। তাঁর স্বামী মতি মিঞা রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। দৈনন্দিন রিকশা ভাড়া ও গ্যারেজ খরচ মেটানোর পর তাঁর হাতে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকে। তবুও সংসার চালাতে তাঁদের প্রায়ই ঋণ নিতে হয়।

তিনটি সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে সাদিয়া আকতার মোহনার পড়াশোনা আর্থিক টানাটানির কারণে বন্ধ করে বিয়ে দিতে বাধ্য হন তারা। দ্বিতীয় মেয়ে সামিয়া আকতার নবোদয় এলাকার সন্দীপন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে এবং ছোট মেয়ে লামিয়া আকতার পড়ে কিন্ডারগার্টেনে।

মারজিনা খাতুন জানান, সামিয়ার মাসিক টিউশন ফি ৭০০ টাকা। সরকারি বই বিনামূল্যে পেলেও গাইডবই কিনতে হয়েছে ১,৫০০ টাকার, আর খাতা-কলমে খরচ হয়েছে ৫৫০ টাকা। এছাড়া ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগের খরচ তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে সামিয়ার পড়াশোনায় বছরে তাঁদের ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা খরচ হয়।

মতি মিঞা বলেন, আগে রিকশা চালিয়ে বেশি আয় হতো এবং জমা জমিও কম দিতে হতো। এখন আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা দিয়ে সংসার চালোনো ও মেয়েদের শিক্ষার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে পড়ার বিপুল ব্যয়

এদিকে মিরপুরের এক অভিভাবক ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে অধ্যয়নরত তাঁর সন্তানের প্রথম বছরের খরচের একটি বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৩৮,২০০ টাকা।

ভর্তি ফি ২২,০০০ টাকা; বই, খাতা ও স্টেশনারি ৫,০০০ টাকা; ইউনিফর্ম ২,২০০ টাকা; জুতা ১,০০০ টাকা এবং স্কুলব্যাগ ৩,০০০ টাকা। গাইডবইয়ের জন্য ২,০০০ টাকা এবং ঐচ্ছিক বইয়ের জন্য আরও ৩,০০০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া ক্লাস পার্টি, পিকনিক ও শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য বছরে বাড়তি ২,০০০ টাকা লাগে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অভিভাবক জানান, মাসিক খরচের মধ্যে রয়েছে টিউশন ফি ৫,০০০ টাকা, স্কুল বাস ভাড়া ৭,০০০ টাকা, খাতা-কলম ১,৫০০ টাকা এবং টিফিন বাবদ প্রায় ৩,০০০ টাকা। এতে মাসিক খরচ হয় ১৬,৫০০ টাকা বা বছরে ১,৯৮,০০০ টাকা। তাছাড়া প্রতিটি পরীক্ষার জন্য স্কুল ৭০০ টাকা করে ফি নেয় এবং অনুপস্থিত থাকলে দিনে ৫০ টাকা জরিমানা করা হয়।

বিকল্প পথ খুঁজছে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলো

মূলধারার স্কুলের ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেকে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটিতে বসবাসকারী রিকশাচালক দেলোয়ার হোসেন জানান, সাধারণ স্কুলে সন্তানকে পড়ানোর সামর্থ্য না থাকায় তিনি তাঁর সন্তানকে একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন। সেখানে থাকা-খাওয়াসহ প্রতি মাসে খরচ হয় ১,৫০০ টাকা।

ঢাকা উদ্যানের রিকশাচালক রাসেলের তিন ছেলে। পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে তিনি তাঁর ১৫ বছর বয়সী বড় ছেলে নিলয়কে একটি পোশাক কারখানায় কাজে দিয়েছেন। ১০ বছর বয়সী দ্বিতীয় ছেলে নিরবকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে মুরগির দোকানে কাজে দিয়েছেন। তাঁর আট বছর বয়সী ছোট ছেলে নেহাত বাড়ির পাশে প্রতিভা স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, যেখানে মাসিক ফি ১,৫০০ টাকা। রাসেল জানান, এই খরচ চালানোও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং তিনি তাকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর কথা ভাবছেন।

সরকারি স্কুলে মান বাড়ানোর তাগিদ

শিক্ষা গবেষক কেএম এনামুল হক বলেন, ২০২২ সালের সমীক্ষার পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় পারিবারিক ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক।

তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বঞ্চিত পরিবারের শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নত করার ওপর তিনি জোর দেন, যাতে অভিভাবকরা কম খরচে ভালো শিক্ষা পান।

শিক্ষাবিদ, শিশুসাহিত্যিক ও সাবেক অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ জানান, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার সুযোগে বৈষম্যও খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাপ্যতা থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যান। আবার মাধ্যমিকে সরকারি স্কুলের চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ফি দিয়ে পড়ার বিকল্প থাকে না। তিনি সরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ানো, মান নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

বিনামূল্যে পোশাক, জুতা ও ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ

বিনামূল্যে বই দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাক, জুতা ও পাটের ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে জুলাই মাস থেকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু হবে।

প্রথম ধাপে ২৫টি উপজেলা ও থানার ৩,৫২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির প্রায় ১ লাখ শিক্ষার্থীকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়। তবে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ অধিদপ্তর ২০৫,০০০ সেট ইউনিফর্ম, ৬৭,৯০০ জোড়া জুতা এবং ১১৫,২১৬টি ব্যাগ পেলেও নভেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত স্কুলে বিতরণ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এটি কার্যকর হলে অভিভাবকদের খরচ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, শিক্ষার পেছনে ব্যয় বাড়লেও এই খাতে বিনিয়োগ কমানো উচিত নয়। মানবসম্পদ উন্নয়নে এই ব্যয়কে একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “আমরা এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাচ্ছি। মানবসম্পদ গঠনে এই সময়টিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে, যা ইতিমধ্যে ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। শিক্ষায় বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”

Views: 0