স্থাবর নয় নদীভাঙা জমি: চরাঞ্চলের হারানো ভিটে ও আইনি পরিচয়ের সংকট
নদীভাঙনে চরাঞ্চলের জমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের আইনি ও প্রশাসনিক পরিচয়। এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন উন্নয়নকর্মী আহমেদ তৌফিকুর রহমান।
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় যেমন সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য বিশেষ আইন ও প্রশাসনিক সুবিধা চালু রয়েছে, চরাঞ্চলের বেলায় ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী অববাহিকায় বছরের পর বছর ধরে বসবাসকারী মানুষদের জমি যখন নদীগর্ভে তলিয়ে যায়, তখন শুধু ঘরবাড়িই ধ্বংস হয় না, তাদের প্রশাসনিক ও আইনি অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে। স্থান পরিবর্তনকারী এসব ভূখণ্ডের মানুষের দায়িত্ব আসলে কার—এ প্রশ্নের স্পষ্ট আইনি উত্তর এখনও অধরা।
ভাঙনে কেবল ভিটেমাটি নয়, বিলুপ্ত হয় পুরো প্রশাসনিক অস্তিত্ব
নদীভাঙনপ্রবণ চরাঞ্চলের মানুষ বহুবার নিজেদের ঘরবাড়ি ভাঙতে বাধ্য হন। বাঁশ, টিনের চাল আর গবাদিপশু নৌকায় তুলে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়া সেখানকার নিয়মিত দৃশ্য। তবে নতুন জেগে ওঠা চরে কিছু অবকাঠামোগত কাজ করা হলেও, চরের হারিয়ে যাওয়া জমির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বা সংবিধিবদ্ধ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু নেই।
জমি যেখানে স্থির থাকে না, সেখানে জমি নিবন্ধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, স্থানীয় সরকারে নাম তোলা এবং প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। মোল্লারহাট ইউনিয়নের সিদ্ধাই চরের উদাহরণ দেওয়া যায়, যেখানে পুরো গ্রাম, বিদ্যালয় ও একটি হস্তশিল্প কেন্দ্র বারবার স্থানান্তর করতে হয়েছে। আবার কুড়িগ্রামের সিরাজবেগের মতো অনেক চর নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। সিরাজবেগের অধিবাসীরা কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে একসঙ্গে পুনর্বাসিত হতে পারেননি; তারা বিভিন্ন চর, উপজেলা, জেলা এমনকি রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়েছেন।
বাস্তুচ্যুত এসব পরিবার যখন নতুন কোনো স্থানে যায়, তখন ভূমি অফিস বা প্রশাসনিক টেবিলে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া স্বত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাদের স্মৃতিতে গ্রামের নাম টিকে থাকলেও মানচিত্রে তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির চিত্র ও বিদ্যমান উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির একটি বড় চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক সমন্বিত হিসাব থেকে। বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৯,৫৫,৫২৭ (৪৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৭) জন মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলা জুড়েই এই সমীক্ষা চালানো হয়, যার বড় একটি অংশ দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তুচ্যুত।
বাস্তুচ্যুতির সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতিপূর্বে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন:
- ২০১৫ সাল: দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির জাতীয় কৌশল গ্রহণ।
- ২০২১ সাল: অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিস্তৃত জাতীয় নীতি প্রণয়ন।
- ২০২২–২০৪২ সাল: নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০ বছর মেয়াদী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।
- অন্যান্য প্রকল্প: ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের আবাসন এবং ‘চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প’ (সিডিএসপি)-এর অধীনে জীবনমান উন্নয়ন।
তবে আবাসন সুবিধা বা আশ্রয় পেলেই মূল সমস্যার সমাধান হয় না। কোনো পরিবার নতুন ঘর পেলেও নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া আগের জমির স্বত্ব ফিরে পায় না। পরবর্তী ভাঙনে তারা ফের বাস্তুচ্যুত হয় এবং প্রশাসনিক নথিতে তাদের পূর্ববর্তী পরিচয়ের প্রমাণ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
চরাঞ্চলের জন্য প্রয়োজন বহনযোগ্য আইনি পরিচয়
বাংলাদেশে উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চরাঞ্চলের মানুষের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গঠন করা জরুরি। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মূল কাজগুলো হতে পারে:
- স্থানান্তরের পরও জমির স্বত্ব ও মালিকানা সংক্রান্ত তথ্যের ডিজিটালি ও কাগুজে অনুলিপি ধরে রাখা।
- নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামের মূল পরিচয় ও যৌথ রেজিস্ট্রি সংরক্ষণ করা।
- বাস্তুচ্যুত পরিবারের শিক্ষা, নাগরিক তথ্য ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি সহায়তা প্রদান।
- কোনো জনপদ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের সন্ধান বজায় রাখা।
মূল লক্ষ্য কেবল মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া নয়; বরং নদী যখন জমি কেড়ে নেয়, তখন যেন তাদের নাগরিক ও আইনি অধিকারও কেড়ে নিতে না পারে—তা সুনিশ্চিত করা।
(লেখক: আহমেদ তৌফিকুর রহমান, রোটারিয়ান ও ২৪ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উন্নয়নকর্মী।)