দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে ‘স্কুল ফিডিং’ বা খাদ্য কর্মসূচির আওতায় আনার বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ শিক্ষার্থী এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় এ সংক্রান্ত পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
শিক্ষার গুণগত মান ও পুষ্টির উন্নয়ন
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার সঠিক ফলাফল, মৌলিক দক্ষতা অর্জন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণের বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, “আমরা শিখন ফল, পুষ্টি, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, যথাযথ তদারকি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মান বাড়াতে কাজ করছি। শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত শিক্ষা পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু এজন্য কেবল শিক্ষকদের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। ঘাটতি কোথায় তৈরি হচ্ছে তা চিহ্নিত করে আমাদের যৌথভাবে সমাধান করতে হবে।”
ঝরে পড়া রোধে পুষ্টিকর খাবারের ভূমিকা
প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হওয়ার পর এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত ফিডিং কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কোনো শিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না। এটি পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক পুষ্টিমান বজায় রেখে বয়স অনুযায়ী খাবার তৈরিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
মান নিয়ন্ত্রণ ও মায়েদের সম্পৃক্ততা
বিদ্যালয় পর্যায়ে খাদ্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখতে উপযুক্ত সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, সরবরাহকৃত খাবারের মান নিয়ে কোনো সংশয় তৈরি হলে কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষা করাতে হবে এবং পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডব্লিউএফপির ইতিবাচক অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে খাদ্য প্রস্তুতি ও পরিবেশন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মায়েদের যুক্ত করার ইচ্ছার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন:
- মায়েদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে খাবার তৈরি ও বিতরণে সরাসরি অংশীদার করা হবে।
- প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মায়েরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রেখে ডিম সিদ্ধ ও সংরক্ষণ শেষে তা বিদ্যালয়ে সরবরাহের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
- এতে খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনায় অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে।
পিইডিপি-৫ ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ
পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর আওতায় প্রাথমিক শিক্ষায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তবে নির্মাণকাজে যাতে কোনো ধরনের নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার বা অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে তদারকি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের প্রতি স্থানীয় মানুষের মালিকানাবোধ তৈরি করতে প্রধান শিক্ষকদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এতে বিদ্যালয়ের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে এবং ইতিবাচক শিখন পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
সভা ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সারফরাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া, ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম প্রধান জেসি উড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক এবং বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এতে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বাহুবল উপজেলার বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দারাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে খাদ্য বিতরণের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, খাবারের মান এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন।

