বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার বিতর্কে জাকসু ভিপি জিতু

0
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার বিতর্কে জাকসু ভিপি জিতু

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলন শুরু হলে তিনি ছাত্রলীগ থেকে সরে এসে আন্দোলনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীতে জাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভিপি নির্বাচিত হন। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার বিতর্ক এখনো কাটেনি।
সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা, এক কর্মীকে আটকের পর ছেড়ে দিতে তদবির এবং কথোপকথনে ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রতি নিজের প্রভাবের ইঙ্গিত দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় তার বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আসাদুল আলম শেখকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল থেকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। হল প্রশাসনের উপস্থিতিতে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিপি জিতুর সঙ্গে তার একটি চ্যাটও পাওয়া যায়। সেখানে আসাদুলকে উদ্দেশ করে জিতু লেখেন, ‘আমি ভিপি হওয়া মানে তুই ভিপি, তোরা ভিপি—একটু মাথায় রাখিস। কোনো কারণে হেরে গেলে তোদেরও ঝামেলা হবে পরবর্তী সময়ে।’
অন্য একটি চ্যাটে তিনি লেখেন, ‘আসাদ, তুই নির্বাচনটা করলে ঝামেলায় পড়বি। আমাকেই নিয়ে এত কিছু শুরু করছে, তাহলে ভাব তোর কী হবে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও জিতুর সঙ্গে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এছাড়া আসাদুল আলম উপাচার্যকে নিয়ে একটি মিথ্যা সংবাদ প্রচার করলে ক্যাম্পাসে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সে সময় ভিপি জিতু নিজেই আসাদুলকে নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে, গত ৫ আগস্ট আল-বেরুনী হল থেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে একই ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান আবীরকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে জাকসু ভিপি জিতুর তদবিরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়টি আবীর স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার পর, জিতু তাকে ক্ষমা করে দিয়ে মুচলেকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সময় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, আসাদুলের সঙ্গে জিতুর কথোপকথন তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাকসু নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শেল্টার দিচ্ছেন অভিযোগ করে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রায় পাঁচ মাস আল-বেরুনী হলে অবস্থানের অভিযোগ উঠেছিল ভিপি জিতুর বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রত্ব শেষ হলে হলে থাকার বৈধতা না থাকলেও, জিতু দাবি করেন জাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে এ বিষয়ে প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আল-বেরুনী হল-সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে জিতুর নামে প্রায় ২৬ হাজার টাকা বকেয়া থাকার অভিযোগ উঠেছে।
দোকানদারের দাবি, বারবার তাগাদা দিলেও তিনি তা পরিশোধ করেননি। এছাড়া গত ৫ আগস্ট আল-বেরুনী হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তিন নেতাকে গালিগালাজ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে বিএনপিতে যোগ দেন জাকসু ভিপি জিতু। ওই অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে জাকসুর হল সংসদের সাতজন ভিপি, তিনজন জিএস এবং একজন এজিএসও ছাত্রদলে যোগ দেন। বিএনপিতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিবর্তন আনলেও তার অতীত ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা এবং পরবর্তী যোগাযোগ নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
জাবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক, ছাত্রদল থেকে বিএনপিতে যুক্ত হওয়া ভিপি জিতুকে নিয়ে বক্তব্য দিতে নাকচ করেন। তিনি বলেন, জিতু ছাত্রদলের নন; তিনি বিএনপির মূল দলে যুক্ত। তাই এ বিষয়ে দলের মূল নেতৃত্বই ভালোভাবে মন্তব্য করতে পারবে।
ছাত্রদলের জাবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক কে এম রিয়াদ বলেন, ভিপি হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুতর। প্রশাসনের উচিত ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা সবার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। আর বিএনপিতে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি দলের মূল নেতৃত্ব দেখবে, ছাত্রদল নয়।
এসব অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
মো. রকিব হাসান প্রান্ত/কেএইচকে/এএসএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *