আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মুখোমুখি অবস্থান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বঘোষিত দেশে ফেরার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগকে ঘিরে আলোচনা তত তীব্র হচ্ছে। যেসব রাজনৈতিক শক্তি একসময় দলটিকে পুরোপুরি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, এখন সেই আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করেই তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য টানাপোড়েন।

একদিকে বিএনপি অভিযোগ তুলছে যে জামায়াতে ইসলামী গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে। অন্যদিকে জামায়াত পাল্টা দাবি করছে, বিএনপি নিজেই আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার চক্রান্তে লিপ্ত। গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাদ পড়লেও তাদের সমর্থকরা কাকে ভোট দেবেন বা আদৌ দেবেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।

পরস্পরবিরোধী অভিযোগ ও গোয়েন্দা বার্তার গুঞ্জন

সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মাসে রাজশাহীর এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে সে সেখান থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। এই অর্থ সরবরাহ করে তারা কাকে সাহায্য করছে? কিছু মানুষ, একটি দল আছে যারা দেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে মিথ্যা বলে বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করেছিল। এই দুই পক্ষ এখন এক হয়ে গেছে।”

স্পষ্টতই এখানে ‘স্বৈরাচার’ বলতে আওয়ামী লীগ এবং ‘টিকিট বিক্রেতা’ বলতে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। জামায়াত এই বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো দাবি করে যে, বিএনপি নিজেই আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে ক্ষমতায় এসেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিএনপি সরকারের আট মাস পার হয়ে গেলেও এ ধরনের সমঝোতার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ মেলেনি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জামায়াত ও দুই বড় দলের রাজনৈতিক কৌশল

বাংলাদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জামায়াত যেমন টিকে থাকার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছে, তেমনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয় দলই রাজনৈতিক প্রয়োজনে জামায়াতকে ব্যবহার করেছে।

  • জিয়াউর রহমানের আমল ও বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময়ে জামায়াতের পুনরুত্থান ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতের ১৮টি আসনের সমর্থনে সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা আনুষ্ঠানিক জোট বাঁধে এবং ক্ষমতায় এসে আল-বদর বাহিনীর সাবেক দুই কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
  • আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের কৌশলগত যোগাযোগ: এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে দুটি দলই সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করে রাজপথে আন্দোলন ত্বরান্বিত করেছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ

গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিলেও এর পেছনে জোরালো কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪-এর সরকার পরিবর্তনের পর মাঠে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত এখন নিজেকে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে। বিএনপি ও জামায়াত—কোনো দলই নিজেদের স্বার্থে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন চায় না। বলা চলে, আওয়ামী লীগ বিরোধিতা এই মুহূর্তে দুই দলকেই এক ধরণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রেখেছে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি:

  1. শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা।
  2. দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
  3. আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা।

এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে জামায়াতের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে হলে বর্তমান সরকারের সঙ্গেই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন হতে পারে।

Views: 0