খুলনা: “টাকা দিন, নয়তো গুলিতে প্রাণ দিন”— তীব্র চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী গ্যাংগুলোর তাণ্ডবে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন খুলনার বাসিন্দারা। ব্যবসায়ী, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিৎসক, জমির মালিক এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও এখন চাঁদাবাজদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গুলিবর্ষণ, হত্যাকাণ্ড এবং সশস্ত্র হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবি করলেও সহিংসতা থামছে না। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগরী ও জেলায় মোট ৭৫ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় ৩৭ জন এবং জেলায় ৩৮ জন নিহত হন। কেবল শেষ ১২ দিনেই সাতটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে চারটি ঘটেছে শেষ দুই দিনে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা
সাম্প্রতিক শিকারদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। স্বজন ও পুলিশের সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার ছাত্রদলের এক নেতার নেতৃত্বাধীন দল তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। হুমায়ুনের ভাইপো সৈয়দ দিদারুল আলম বিপ্লব খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরাফাত হোসেন এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। একই সময়ে যুবদলের বর্তমান ও সাবেক তিন নেতাসহ অন্তত পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি টাকার দাবি
খুলনায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে পুলিশ কর্মকর্তারাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ৯ অক্টোবর দুর্বৃত্তদের কোপে আহত হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন ‘বি কোম্পানি’ নামের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ খুলনা কমার্স কলেজের কাছে এক প্রখ্যাত চিকিৎসকের কাছে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। হুমকির মুখে তিনি চেম্বার বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। একই এলাকার আরেক চিকিৎসকের কাছে ২ কোটি টাকা দাবি করা হলে তিনি ভারতে চলে যান। তাদের কেউ লিখিত অভিযোগ করতে সাহস পাননি।
অন্যান্য অপরাধের বিবরণ:
- উপ-রেজিস্ট্রারকে জিম্মি: ৭ অক্টোবর খুলনা সদর উপ-রেজিস্ট্রার অফিসের উপ-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে প্রতি মাসে ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয় বলে খবর পাওয়া যায়, যদিও তিনি এই দাবির কথা অস্বীকার করেছেন।
- সন্ধানী ক্লিনিকে হামলা: সন্ধানী ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে ১ কোটি টাকায় বিষয়টি রফা হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া ২৫ অক্টোবর সোনাডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় শাখাতেও অস্ত্র প্রদর্শন করে দুর্বৃত্তরা।
- সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নিগ্রহ: ৮ আগস্ট বটিয়াঘাটা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অনিন্দ্য কুমার দাসকে মারধর ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান। ২৮ অক্টোবর রূপসার তুতপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসির ম্যানেজার বাবুর কাছে ২০ লাখ টাকা ও ১০টি মোটরসাইকেল চাঁদা দাবি করা হলে ফার্মেসি বন্ধ করে তিনি আত্মগোপন করেন। ওই সন্ধ্যায় আহসান আহমেদ রোডের চায়নিজ প্যালেসেও ভাঙচুর চালানো হয়।
- অন্যান্য হুমকি ও গ্রেফতার: ২৬ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আহসানআরা বিনতে আহমেদকে “টাকা দিন, নয়তো রক্ত দিন” বলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। মামলা হলে পুলিশ দুজনকে আটক করে। একই দিনে পাইকগাছা উপজেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিএম আবদুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক জিএম আক্কাস আলীকেও ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনায় বাগেরহাটের রামপাল থেকে ইমরান (গ্রেনেড বাবু নামে পরিচিত), তার স্ত্রী ও মাকে গ্রেফতার করা হয়।
একের পর এক গোলাগুলি ও রক্তাক্ত ঘটনা
চাঁদাবাজির পাশাপাশি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও শহরজুড়ে আতঙ্ক বাড়িয়েছে:
- ২৪ অক্টোবর কলেজ শিক্ষক ও মুদি দোকানদার ধনঞ্জয় কুণ্ডু (আকাশ কুণ্ডু, ৪৫) গুলিবিদ্ধ হন।
- ২৭ অক্টোবর নিরালা এলাকায় সিগারেট কোম্পানির ডেলিভারি কর্মী সালমানকে গুলি করা হয়।
- ২৬ অক্টোবর বটিয়াঘাটায় যুবদলকর্মী সোহেল এবং ২৭ অক্টোবর যুবদল সভাপতি ওহিদুল ইসলাম বাদল গুলিবিদ্ধ হন। ২৪ অক্টোবর তেরখাদার মধুপুুরে যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাসও গুলিবিদ্ধ হন।
- ২২ অক্টোবর লবণচরা এলাকায় ব্লেড বাবুর স্ত্রী খুশিকে গুলি করা হয়। একই দিন সদর থানার পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় পলাশ গ্রুপের সদস্য তুষার গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
- ১৭ অক্টোবর তুতপাড়া আমতলা মোড়ে জুম্মান ওরফে জুম্মা এবং ক্লে রোডে হকার্স ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলমকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। একই দিনে মৌলভীর দরগা রোডে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলেও তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।
- ১০ অক্টোবর কাশেম নগরে আশিকুজ্জামান জনি গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় নিজ বাড়ির সামনে চা খাওয়ার সময় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা মো. নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম নিহত হন।
নজরদারিতে চিহ্নিত ৯ সন্ত্রাসী গ্যাং
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ৯টি প্রধান সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম উঠে এসেছে। এসব চক্রের সদস্যরা জনাকীর্ণ স্থানেও প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে দ্বিধা করে না। পুলিশ সূত্রের চিহ্নিত গ্রুপগুলো হলো:
- বি কোম্পানি: রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন, যা খুলনা শহরজুড়ে সক্রিয়।
- পলাশ গ্রুপ: শেখ পলাশের নেতৃত্বাধীন।
- নূর আজিম গ্রুপ ও আশিক বাহিনী: খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায় সক্রিয়।
- টেনকি শাওন গ্রুপ: শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের নেতৃত্বে সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে সক্রিয়।
- আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনী: দৌলতপুর ও খান জাহান আলী এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী।
- শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ: শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নিহত নাসিমুল গনির নাসিম গ্রুপ।
এছাড়া দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া এলাকায় ছোট ছোট বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গ্যাং মাদক, অস্ত্র ব্যবসা, জমি দখল, বালু ব্যবসা এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে সক্রিয় রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও বক্তব্য
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে মাদকের বিরোধ। তিনি বলেন, “তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া সাধারণ মানুষও সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।”
খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক সরকার জানান, জেলাজুড়ে ব্লক রেইড ও বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধীরা যাতে দ্রুত জামিন না পায় সেজন্য আদালতের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
