বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে খাবার ও ওষুধ সংকট, চরম ঝুঁকিতে ৩ হাজার রোগী

বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) গত জুলাই মাস থেকে সরকারি খাদ্য বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। ফলে সেখানে ভর্তি থাকা প্রায় ৩ হাজার রোগী দৈনন্দিন খাবার পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী মার্চের মধ্যে প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ না মিললে রোগীদের খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট এই আঞ্চলিক হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন। এদের মধ্যে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ জন ভর্তি থাকেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নেন ২ হাজারের বেশি মানুষ। অর্থ সংকট থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারের অনুরোধে এতদিন খাবারের ব্যবস্থা চালু রেখেছিল। তবে খরচ কমাতে গত ১৫ অক্টোবর থেকে রোগীদের মেনু থেকে ডিম বাদ দেওয়া হয়েছে।

আহার জোগাতে হিমশিম ও বাজেট ঘাটতি

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, জুলাই থেকে বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে অনুরোধ করে খাবার সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রতি রোগীর খাবারের খরচ ১৫ টাকা কমিয়েছি। ডিম ছাড়া মেনু থেকে অন্য কিছু বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বরাদ্দ এলে আবার ডিম দেওয়া হবে। আর সরকারি অর্থ না পাওয়া গেলে মার্চ থেকে খাবার দেওয়া বন্ধ করা ছাড়া আমাদের কোনো পথ থাকবে না।”

তিনি আরও জানান, বর্তমান বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার জন্য যে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাসের ১১ দিনের খরচ চালানোও সম্ভব হয় না।

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ও শয্যা সংকট

বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলাসহ আশপাশের এলাকার স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি। ১ হাজার শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকায় চরম স্থান সংকট তৈরি হয়েছে। মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন সহস্রাধিক রোগী। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সংকটাপন্ন রোগীদেরও ক্ষেত্রবিশেষে মেঝেতেই রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

রোগী ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য করিডোর, বারান্দা ও খোলা জায়গায় অতিরিক্ত ৯৭৮টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান পরিচালক। এছাড়া প্রতি রোগীর সঙ্গে দুই থেকে তিনজন স্বজন থাকায় প্রতিদিন হাসপাতালে প্রায় ১০ হাজার মানুষের ভিড় জমে, যা চিকিৎসার স্বাভাবিক পরিবেশ ও চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

ওষুধ সংকট ও বন্ধ ডায়াগনস্টিক সেবা

খাদ্য সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালে জরুরি ওষুধের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক্স-রে ফিল্ম ও থাইরয়েড পরীক্ষার উপাদানের অভাবে পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় সামগ্রী না থাকায় সেবা প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে।

ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল ব্যাধির ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল। ফলে অনেক বড় ধরনের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

১৩টির মধ্যে ৮টি লিফট বিকল

হাসপাতাল ভবনের অধিকাংশ লিফট অকেজো থাকায় রোগী পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মোট ১৩টি লিফটের মধ্যে ৮টিই বিকল। এর মধ্যে পুরনো ভবনের ৯টির মধ্যে ৫টি এবং নতুন ভবনের ৪টির মধ্যে ৩টি লিফট কাজ করছে না। এতে আশঙ্কাজনক রোগীদের ট্রলিতে করে ওপরের তলায় নিয়ে যেতে স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

লিফট মেরামতে বিলম্বের জন্য গণপূর্ত বিভাগকে (পিডব্লিউডি) দায়ী করেছেন পরিচালক। তবে গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশেদুজ্জামান জানান, মেরামতের খরচের প্রাক্কলন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অর্থ অনুমোদন ও দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের পর কাজ শুরু হবে।

রাজস্ব আয় অর্ধেকে নেমেছে

হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও বাইরের প্যাথলজিতে পরীক্ষা পাঠানোর কারণে রাজস্ব আয় কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিচালক। তিনি জানান, হাসপাতালে দৈনিক প্রায় ১,১০০ রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সক্ষমতা থাকলেও এখন গড়ে মাত্র ৫০০টি পরীক্ষা হচ্ছে, যেখানে দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২,০০০। এর ফলে গত বছরের তুলনায় হাসপাতালের নিজস্ব রাজস্ব আয় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

Views: 0