মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ক্যাপিটল হিল ও রাজ্য শাসনের নতুন সমীকরণ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন কী এবং কেন এটি তাৎপর্যপূর্ণ?

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ক্যাপিটল হিলে দেশটির সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন কারা, তা নির্ধারিত হয়।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে প্রতি চার বছর পরপর এই ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকরা ইউএস কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সেনেট-এর জন্য নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। পাশাপাশি বেশ কিছু রাজ্যে গভর্নর পদের জন্যও ভোট গ্রহণ করা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ‘সেন্টার ফর পলিটিক্স’-এর নির্বাচন বিশ্লেষক জে মাইলস কোলম্যানের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো মূলত “ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ও তার দলের পারফরম্যান্স যাচাইয়ের গণভোট।” তিনি জানান, সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট থাকলে প্রেসিডেন্টের দল ভালো ফল করে; অন্যথায় বিপরীতচিত্র দেখা যায়। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের আসন বিন্যাস

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সর্বমোট ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং তাদের মেয়াদকাল দুই বছর। উদাহরণস্বরূপ, আয়তনে বড় হলেও কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্য ওয়াইওমিং থেকে মাত্র ১ জন প্রতিনিধি রয়েছেন। অন্যদিকে, আয়তনে ছোট হওয়া সত্ত্বেও বেশি জনসংখ্যার রাজ্য নিউ জার্সিতে সদস্য সংখ্যা ১২ জন।

কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের প্রতিনিধিরা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটির জন্য ২ জন করে সেনেটের মোট আসন সংখ্যা ১০০। প্রতি দুই বছর অন্তর এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। এ বছর ৩৫টি সেনেট আসনে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে।

রাজ্য পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও গভর্নর নির্বাচন

নির্বাচনে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা তাদের গভর্নর নির্বাচন করবেন, যার মেয়াদ সাধারণত চার বছর। গর্ভপাত আইন, শিক্ষা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত রাজ্য পর্যায়ে নেওয়া হয়। ফলে রাজ্যে ডেমোক্র্যাট নাকি রিপাবলিকান শাসন থাকছে, তার ওপর নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে।

বর্তমান আসন বিন্যাস ও সম্ভাব্য পরিবর্তন

বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের হাতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তবে এই ব্যবধান অত্যন্ত কম।

  • প্রতিনিধি পরিষদ: রিপাবলিকানদের ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি এবং নির্দলীয় সদস্যের ১টি আসন রয়েছে (যিনি সাধারণত রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দেন)। ২টি আসন ফাঁকা আছে। অক্টোবরের শেষে মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস-কে কোলম্যান বলেন, “ডেমোক্র্যাটরা অন্তত প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে তা হবে বড় বিস্ময়।” প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন মাত্র ৪টি অতিরিক্ত আসন।
  • সেনেট: রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি এবং নির্দলীয় সদস্যের আসন ২টি (যাঁরা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেন)। সেনেটে ভোটাভুটিতে ৫০:৫০ টাই হলে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ধারক ভোট দেন। ফলে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স টাই হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। ডেমোক্র্যাটদের এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৪টি আসন প্রয়োজন।

নজরকাড়া কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

প্রতিনিধি পরিষদের আইওয়া, ভার্জিনিয়া ও মন্টানার বেশ কিছু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, সেনেটে সবচেয়ে বড় চমক দেখা যেতে পারে টেক্সাস রাজ্যে। জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালা রিকো ও রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের মধ্যে সমানে সমান লড়াই চলছে। ১৯৯৪ সালের পর থেকে টেক্সাসে রাজ্য পর্যায়ে কোনো ডেমোক্র্যাট জিততে পারেননি। উল্লেখ্য, রাজ্যের প্রভাবশালী বুশ পরিবারের (সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর ছেলে জর্জ ডব্লিউ বুশ) কয়েকজন সদস্যও তালা রিকোকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

গভর্নর নির্বাচনের ক্ষেত্রে মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে:

  • মিনেসোটা: ডেমোক্র্যাট অমি ক্লোবুচার লড়ছেন কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান লিসা ডিমুথের বিরুদ্ধে। সেখানে দীর্ঘ দুই দশক ধরে সেনেটর থাকা ক্লোবুচারের জয়ের সম্ভাবনা বেশি।
  • জর্জিয়া: কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাট কিশা ল্যান্স বটমস লড়ছেন রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী এই দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হচ্ছে এবং বটমসের জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেয়ে কম থাকে, তবে এ ভোটের ফল আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণে চরম প্রভাব ফেলবে।

Views: 0