হিমাগার ভাড়া নির্ধারণে জেলা সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি কৃষকদের

0
হিমাগার ভাড়া নির্ধারণে জেলা সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি কৃষকদের

একদিকে মাঠে উৎপাদিত আলুর ন্যায্য দাম মিলছে না, অন্যদিকে হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, সার-বীজ ও কীটনাশকের ব্যয় মিটিয়েও কৃষক যখন বাজারে আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না, তখন অতিরিক্ত হিমাগার ভাড়া তাদের লোকসানের বোঝা আরও ভারী করে তুলছে। কৃষকদের ভাষায়, আলু ফলিয়ে এখন লাভের হিসাব নয়, বরং লোকসান কত কমানো যায়-সেই চিন্তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণে জেলা সুপারিশ কমিটির সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন রাজশাহীর কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, বস্তার নিট ওজন থেকে ৫ কেজি বাদ দিয়ে প্রতি কেজি আলুর সর্বোচ্চ সংরক্ষণ ভাড়া ৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে। এ সুপারিশের বাইরে একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বৃহত্তর কর্মসূচি এবং প্রয়োজনে আইনগত লড়াইয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজশাহীর পবা উপজেলার তকিপুরে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ের সামনে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ, সহসভাপতি মিজানুর রহমান মিলন, সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি ও সংগঠনের সদস্য মিঠু হাজী বক্তব্য দেন। এ সময় সংগঠনের অন্যান্য নেতা ও আলু চাষিরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জেলা সুপারিশ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বস্তার নিট ওজন থেকে ৫ কেজি বাদ দিয়ে প্রতি কেজি আলুর জন্য সর্বোচ্চ ৫ টাকা হিমাগার ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এ সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ব্যত্যয় তারা মেনে নেবেন না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে তারা হিমাগারে আলু সংরক্ষণের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের লক্ষ্যে পৃথক সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন জেলার সুপারিশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে জমা হয়েছে।
তিনি বলেন, জেলা সুপারিশ কমিটির সুপারিশের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত এলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনগত লড়াই চালানো হবে। হিমাগার মালিকেরা উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিলে কৃষকরাও তাঁদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় উচ্চ আদালতে যাবেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি অভিযোগ করেন, উত্তরাঞ্চলে দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদিত হলেও হিমাগার মালিকেরা যোগসাজশ করে সংরক্ষণ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে বাজারে আলুর দাম কম থাকায় এবং হিমাগার ভাড়া বাড়ায় কৃষকের লোকসান আরও বেড়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঐক্যবদ্ধভাবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতা ও হিমাগার মালিকদের অসহযোগিতার মধ্যেও জেলা সুপারিশ কমিটি একটি প্রায় নিরপেক্ষ সুপারিশমালা তৈরি করেছে। সুপারিশের কিছু বিষয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভিন্নমত থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে তারা তা মেনে নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহী জেলা সুপারিশ কমিটির প্রতিবেদনের ৮ নম্বর কলামে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি আলু বাদ দিয়ে প্রতি কেজি আলুর ভাড়া ৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন আলু উৎপাদনকারী জেলার প্রতিবেদনেও গড়ে প্রতি কেজি আলুর ভাড়া ৫ টাকা ২০ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও হিমাগার মালিকদের অনড় অবস্থানের কারণে যৌক্তিক ভাড়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন

মাগুরা মেডিকেল কলেজ / অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ক্যাম্পাসের দাবি

সমিতির সহসভাপতি ও আলুচাষি মিজানুর রহমান মিলন বলেন, হিমাগারের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা চাই, যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
সমিতির সদস্য ও আলুচাষি মিঠু হাজী বলেন, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও ভোক্তার ওপর। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে কোনো সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন না।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে। এর সঙ্গে হিমাগারের ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের সংরক্ষণ ব্যয় আরও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে আলুর বাজারদরেও। তাই কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-তিন পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জেলা সুপারিশ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত হিমাগার ভাড়া চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
জেলা সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
মনির হোসেন মাহিন/এনএইচআর/এএসএম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *