যার কবিতার বুনট পলিমাটির মতো উর্বর
দীপন কুমার রায়কবি ইহান আরভিনের কবিতার বুনট একদম পলিমাটির মতো উর্বর। ভাবুক পাঠকদের অনন্য ভাবনার জগতে ডুবে যেতে তাগিদ দেবে। শব্দের চমৎকার গাঁথুনি হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এমনই একটি কাব্যগ্রন্থ ‘নীরক্ত ধূসর দুঃখী পাতাগুলো’। নিজেকে চিরন্তন সত্যের সম্মুখীন করতে, অনিবার্য মৃত্যুর পথযাত্রী হিসেবে একটা ভাবনার সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। যেন জীবনের সব দুঃখ-বেদনার দেওয়াল টপকে মৃত্যুকে ভয় না করে নিষ্ঠুর মৃত্যুকে সহজে আলিঙ্গন করতে পারে নশ্বর মানুষ।
কাব্যের প্রথম কবিতা ‘একটি দিনের শেষে মৃত্যু আসে রাতে’র ভাবার্থ এমন পাই যে, আমরা প্রতিনিয়ত মরছি। প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে। কবি কী চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করছে মাটির ঘ্রাণ। ঝরাপাতার মাড়িয়ে যাওয়া মর্মর শব্দ। অনিত্য সংসারের সবটুকু পছন্দের উপাদান নিয়ে কাব্যিক ভাষার চটুল তুলিতে আঁকতে চেয়েছেন জলছবি। যেন একটি কবিতা একটি ছবি। আর সেটি একটি গল্পের ভুবন।
কখনো চাঁদের সাথে, পাতার সাথে, পাখির সাথে, ফুলের সাথে, কখনো শারদ হাওয়ার সাথে নিঃসঙ্গতা, মাকড়সার জালের মতো বিস্তীর্ণ করেছে শব্দে শব্দে। তার কবিতা যেন বিষাদ ও বেদনার বহিঃপ্রকাশ। এই কাব্যগ্রন্থের আরও একটি দীর্ঘ পঙ্ক্তিমালার ‘দূরাগত এক শব্দের পেছনে’ কবিতাটি তার সুন্দর উদাহরণ। কবির কথামালা মনে করিয়ে দেবে আনমনা কৈশোর জীবনের স্মৃতি। নদীর পাড়ে খালি পায়ে নেমে বালিতে কে না এঁকেছেন পদচিহ্ন; তেমন কয়েকটি লাইন—‘আমার পা দেবে যাচ্ছে চোরাবালির ভেতরপায়ের নিচে একটি খোল সমেত শামুকএকটিমাত্র ক্ষীণ শব্দ নিয়ে হাঁটছে;…’
আরও পড়ুন
‘আরণ্যক’ নিয়ে কেন এত আলোচনা, কী আছে এতে?
‘মুখগুলো চলে যায় পরোক্ষে’ কবিতার চমৎকার একটি লাইন—‘জীবনের ধোঁকা কে বোঝে!’ এ ছাড়া এই কাব্যগ্রন্থের দীর্ঘতম যে কবিতাগুলো গ্রাম থেকে নগর, পৃথিবীর থেকে মহাবিশ্ব নিয়ে ভাবনার পরিসর ব্যপ্তি ঘটাতে পারে। কবির এই সমৃদ্ধ শব্দমঞ্জুরী শিল্পগুণকে ও পাঠকদের ঋদ্ধ করবে বলে আশা করি। প্রত্যেকটি কবিতায় কিছু একটা গল্প পূর্ণতা পায়। এই কবিকে বিমর্ষ-বেদনার্ত কবি বলা যায়।তার কবিতাগুলোর কিছু লাইন; যেগুলো আমার কাছে পছন্দ হয়েছে:
কবি কি কখনও সংসারী হয়েছেআঁচল-পাতা মায়ার সংসারে।
আবার ফিরবো মাতৃগর্ভেহাতে নিয়ে জখম স্মৃতির রেশ।
নির্জন কবি মরে থাকলো ঘাসের ছায়ায়।
আমি চোখ খুললামদেখলাম মানুষের রক্ত।সময় বদলে গেলপৃথিবী হলো পুঁজিবাদী জাহাজ।
আরও পড়ুন
মা একটি নদীর নাম: সত্যিকারের জীবনগাথা
এমনই অনেক পঙ্ক্তিমালায় সমৃদ্ধ ‘নীরক্ত ধূসর দুঃখী পাতাগুলো’। আশা করি বইটি পাঠকের ভালো লাগবে। আমি বইটির বহুল পাঠ ও প্রচার কামনা করছি।
বই: নীরক্ত ধূসর দুঃখী পাতাগুলো কবি: ইহান আরভিনপ্রচ্ছদ: আসিফ মুক্তপ্রকাশক: নৈঋতা ক্যাফেমূল্য: ৩০০ টাকা।
এসইউ