আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি জানান, সৌর বিদ্যুতের বিস্তার সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এর পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক ছাড় এবং নানাবিধ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বিশেষ তহবিল ও নেট মিটারিং
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কলকারখানা ও বাসাবাড়ির ছাদকে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে চায় সরকার। সৌর বিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানান তিনি:
- নেট মিটারিং সুবিধা: সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা জাতীয় গ্রিডে যে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করবেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে (প্রণোদনা সহ) তা কিনে নেবে।
- ১,৫০০ কোটি টাকার তহবিল: উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে প্রাথমিক পর্যায় ১,৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
- শুল্ক ছাড়: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে এই খাতে ৮ হাজারের বেশি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী গ্রাহকদের সঠিক সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কৃষি খাতে ১৭ হাজার সেচ পাম্পকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনা হচ্ছে
কৃষি খাতে সৌর শক্তির অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেচ পাম্পগুলোকে সৌর বিদ্যুতে রূপান্তরিত করার কাজ বরেন্দ্র অঞ্চলে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে অন্তত ১৭,০০০ সেচ পাম্পকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও খুচরা উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
জ্বালানি সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, পূর্বে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তায় দেশকে বিদ্যুৎ সংকটে পড়তে হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:
- ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৩,০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।
- বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনাকাটায় নতুন করে আরও ৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
- ডিজেল ও কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প উৎসের সাথে আলোচনা চলছে।
- ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীত সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট না করে এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
নিজ বাসভবনে সোলার প্যানেল ও তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা
দেশবাসীকে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করে তারেক রহমান বলেন, “আপনাদের কাছে আহ্বান জানানোর আগেই আমি আমার নিজের বাসভবনে সোলার প্যানেল বসিয়েছি। প্রতিদিন উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আমি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছি।” তিনি দিনের আলো ব্যবহার করা এবং অপচয় কমানোর অনুরোধ জানান।
অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্ভাবনী ধারণা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। তিন শতাধিক তরুণের মধ্য থেকে সেরা উদ্ভাবকদের মূল্যায়িত করা হয়। তরুণদের নতুন উদ্ভাবন যেন অর্থের অভাবে ভেস্তে না যায়, সেজন্য চলতি বাজেটে স্টার্টআপদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইডকল (IDCOL)-এর যৌথ আয়োজনে এবারের এক্সপোর মূল প্রতিপাদ্য—“ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহার করুন, সৌর বিদ্যুৎ থেকে আয় বাড়ান”। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এতে অন্যান্যদের মধ্যে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুক বক্তব্য রাখেন।