তুরস্কের আন্তালিয়ায় আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩১তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (সিওপি৩১)। এই সম্মেলনকে সামনে রেখে ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক স্তরে স্বচ্ছতা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের নীতি নির্ধারক, সুশীল সমাজ ও গবেষকরা।
‘ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ’ (সিজেএ-বি)-এর অবস্থানপত্র, ৩৩টি সংগঠনের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপ এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নীতি সংক্ষেপে আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ তদারকি জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের জোর দাবি
রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম উন্নত দেশগুলোকে ঋণের পরিবর্তে অনুদান হিসেবে জলবায়ু অর্থায়ন দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে অবশ্যই বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
৫৪টি নাগরিক সমাজ সংগঠনের জোট সিজেএ-বি উন্নত দেশগুলোকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা মেনে চলা এবং নিজেদের আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণের তাগিদ দিয়েছে। জোটের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বার্ষিক অভিযোজন প্রয়োজন ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ৬০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে’ প্রতি বছর প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও এ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে জমা হয়েছে প্রায় ৪১৪ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়নের বিশাল ঘাটতি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত ব্যাপক। হালনাগাদকৃত জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি ৩.০) অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০.৩১ শতাংশ বা ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমপরিমাণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-২০৫০)-এর ১১৩টি উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার।
টিআইবির নীতি সংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এসেছে মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ডলার। দেশে বর্তমানে বার্ষিক অভিযোজন প্রয়োজন ৮.৫ থেকে ১২.৫ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু লভ্য অর্থায়নের পরিমাণ মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থায়ন ব্যবস্থার ধীরগতি ও অভ্যন্তরীণ সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটি অক্সফামের তথ্যের বরাতে জানায়, ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলো ১৩৭ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন দেওয়ার দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৩ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। দ্বৈত গণনা ও পুরোনো উন্নয়ন সহায়তা নতুন নামে দেখানোর কারণে এই ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, প্রদত্ত অর্থের প্রায় ৬৭ শতাংশই ছিল ঋণ।
তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার চিত্র তুলে ধরে টিআইবি জানায়, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রথম কিস্তি ছাড় করতেই গড়ে ৫৬২ দিন সময় নেয়। এমনকি ৯২ শতাংশ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে অর্থ ছাড় পেতে ব্যর্থ হয়।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-এ বাজেট হ্রাস এবং তদারকির দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ফান্ডের ৮.৭৩ বিলিয়ন টাকা এখনও পদ্ম ব্যাংকে আটকে রয়েছে। টিআইবি ট্রাস্ট ফান্ডের বরাদ্দ বৃদ্ধি, আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার, এনডিসি হালনাগাদ, জ্বালানি মাস্টার প্ল্যান সংশোধন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রমান্বয়ে পরিহারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার চেয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের আহ্বান
জাতীয় সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা জলবায়ু নীতি নির্ধারণে তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং স্থানীয়ভিত্তিক অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।
