টঙ্গীর হাজির মাজার বস্তি: সাবেক সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় মাদকের বিশাল আস্তানা

গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত হাজির মাজার বস্তিটি দীর্ঘ দিন ধরেই ওই অঞ্চলের অন্যতম বড় মাদকের বাজার হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ শৌরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর পর এই বস্তির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

প্রায় পাঁচ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই বস্তিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে কেবল আবাসিক এলাকা হিসেবেই নয়, দিন-রাত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এটি বহুল পরিচিত।

রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পুরো বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছেন। পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশে এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

পুলিশের একটি সূত্রের তথ্যমতে, গণপূর্ত বিভাগের উচ্ছেদ অভিযান এবং পুলিশের নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও এখানে মাদকের কারবার থেমে নেই। পুরো গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহের অন্যতম প্রধান আস্তানা এটি। এখানে ২৪ ঘণ্টাই চলে কেনাবেচা।

সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ

মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের চক্র পুরো এলাকা নজরদারিতে রাখতে প্রায় ৫০০ সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। সোর্সদের হাতে দেওয়া হয়েছে ওয়াকিটকি। এছাড়া মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য বস্তির নিচে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির অভিযোগ রয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শক্ত নেটওয়ার্কের কারণে বাইরের মানুষের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকেও বড় দল নিয়ে বিশেষ প্রস্তুতিসহ অভিযানে যেতে হয়। রাতে কোনো সমন্বিত অভিযান ছাড়া সেখানে ঢোকাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর অপরাধ) এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, এই এলাকায় প্রায় ৬০ বছর ধরে মাদকের কারবার চলছে। এটিকে একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আস্তানাটি সমূলে উপড়ে ফেলতে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে পুলিশের টহল গাড়ি ও একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। সম্প্রতি এক অভিযানে প্রধান বিক্রয়কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে অপরাধীরা এখন আর আগের মতো প্রকাশ্যে আসতে পারছে না।

ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ বাসিন্দারা

স্থানীয় সাধারণ অধিবাসীরা জানান, মাদক ব্যবসায়ীরা বস্তির প্রবেশপথে নিজস্ব লোক বসিয়ে সাধারণ মানুষের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করে। নতুন কোনো মুখ দেখলে আটকে জেরা করা হয়। দিনের বেলা কেনাবেচা কিছুটা আড়ালে হলেও রাতে বসে মাদকের বিশাল হাট।

মো. আকরাম নামে এক রিকশাচালক জানান, মাদকের লেনদেন ও টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধের কারণে রাতে প্রায়ই মারামারি ও গুলির শব্দ শোনা যায়, যার ফলে পরিবার নিয়ে তারা আতঙ্কে রাত কাটান।

বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইশতিয়াক মাহমুদ বলেন, বস্তির ভেতরে ও সংলগ্ন সড়কে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলে। তাদের ভয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই, নিচু স্তরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও চুপ থাকেন।

তিন সন্তান নিয়ে বস্তিতে বসবাসকারী তানিয়া নামে এক গৃহকর্মী জানান, আর্থিক সংকটের কারণে কম ভাড়ায় বাধ্য হয়ে এখানে থাকেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও দায়িত্বশীলদের ছত্রছায়াতেই এই অপকর্ম চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

যাদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

বাসিন্দাদের অভিযোগ, টঙ্গী থানা বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাশেদুল ইসলাম কিরণ এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী রবিউল ইসলাম বাবু ওরফে ‘কিং বাবু’র নিয়ন্ত্রণে এই মাদকের সাম্রাজ্য চলছে।

এছাড়া এই চক্রের সঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাজারপাড়া ইউনিট বিএনপির সিদ্দিকুর রহমান ডুবলি, শাহাবউদ্দিন ডাবারু, আরাফাত ওরফে ‘ইয়াবা আরাফাত’, ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আলকাছ মিয়া এবং নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, এদের অধীনে অন্তত ৫১০ জনের একটি সশস্ত্র বাহিনী কাজ করে।

রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান

গত ৩১ আগস্ট রাজউকের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টঙ্গী বাজার সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

রাজউকের উপপরিচালক লিটন সরকার জানান, হাজির মাজার বস্তি এলাকায় রাজউকের প্রায় তিন বিঘা জমি দীর্ঘ দিন ধরে মাদকসেপী ও কারবারিদের দখলে ছিল। সেই জমি উদ্ধার করা হয়েছে এবং নতুন করে যেন কোনো দখল বা মাদকের স্পট তৈরি হতে না পারে, সেজন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যু রহস্য ও মামলার অগ্রগতি

তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ শৌরির মৃত্যুর আসল কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার বাবা আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর দাবি প্রত্যাখ্যান করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

গত ২৭ অক্টোবর রাতে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন তাহসিফ। নদীর পাড়ে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তদন্তকারীদের দীপ জানিয়েছেন, কয়েকজন ব্যক্তি তাদের তাড়া করলে তাহসিফ ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে কারা তাদের তাড়া করেছিল এবং কেন তারা রাতে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে গত ৪ নভেম্বর আদালত তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দিশা ও তাহসিফ উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্তোরাঁ এবং সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাক্সে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে যান। মামলার তদন্ত স্বার্থে দিশার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

Views: 0