ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার সারুটিয়া ও ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের গড়াই নদীতে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। গত কয়েক বছরের দুই ইউনিয়নের প্রায় ৫টি গ্রামের শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের স্রোত এখন নদীপাড়ের বাসিন্দাদের উঠানে আছড়ে পড়ছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে প্রমত্তা গড়াইয়ের নতুন ভাঙনে চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সারুটিয়া ইউনিয়নের বুরুড়িয়া গ্রামের কয়েকশ’ বিঘা ফসলি জমি গড়াই নদীরে ভাঙনে নদীগর্ভে চলে গেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারাও অনেকেই বসতভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্য এলাকায়। ভাঙন রোধে বুরুড়িয়া গ্রামের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ফেলা হয়েছে জিও ব্যাগ। পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা) এসব জিও ব্যাগ ফেলার দায়িত্ব পালন করছে।
এ দিকে ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের মাইজদি, উলুবাড়িয়া এলাকায় নতুন করে গড়াই নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গড়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতে তীব্র স্রোত শুরু হয়েছে। স্রোতের তোড়ে উলুবাড়িয়া গ্রামের নদীঘেঁষা কয়েকটি পয়েন্টে এরই মধ্যে প্রায় শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়রা এখন বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন পার করেছেন। গ্রামের শিশুরাও নদীর পাড়ে চলাফেরা ও খেলাধুলা করতে ভয় পাচ্ছে। শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন নদীপাড়ের পরিবারগুলো।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আলম খান বলেন, আমার প্রায় ১২ বিঘা ফসলি জমি এই নদী গিলে খেয়েছে। এখন বাড়ির পেছনে নদীর ভাঙন চলে এসেছে। কখন যে বাড়িঘর নদীর পেটে চলে যাবে, আল্লাহই ভালো জানেন।
তিনি বলেন, উলুবাড়িয়া গ্রামের নদীপাড়ের অনেক বাসিন্দা ভাঙন আতঙ্কে বাড়িঘর ফেলে অন্য এলাকায় চলে গেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কয়েকটি জায়গায় সীমিত আকারে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।
কৃষক আলম খান বলেন, আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আমাদের বাঁচান। বসতিভিটা ছাড়া আমাদের আর কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। এইটুকুও যদি নদীর পেটে চলে যায়, তাহলে আমাদের পথে দাঁড়াতে হবে।
লাঙ্গলবাঁধ গ্রামের বাসিন্দা শাহিন জানান, গত ১০ বছরে গড়াই নদীর ভাঙন এতটা বেড়েছে যে, বুরুলিয়া ও উলুবাড়িয়া গ্রামের মৌজার অনেক জমি এখন নদীর বিপরীত পাড়ে চলে গেছে। নদীর যেখানে অবস্থান ছিল, যে প্রস্থ ছিল, সেটি ভাঙনের কারণে এখন ঝিনাইদহ অংশে চলে এসেছে।
শাহিন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলছে নিয়মিত। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। এখানে ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই ব্লকের বাঁধ দরকার। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, গড়াই নদীর ভাঙন রোধে যেন দ্রুত ব্লক বসিয়ে তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) তথ্য, শৈলকূপা উপজেলার সারুটিয়া ইউনিয়নের বরুড়িয়া, ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের উলুবাড়িয়া, মাইজদি, লাঙ্গলবাঁধ এলাকায় অন্তত সাড়ে ৫ কিলোমিটার নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাড়ে ৫ কিলোমিটার নদীপাড়ের ৫টি পয়েন্টে ভাঙনের তীব্রতা বেশি। এসব পয়েন্টে কয়েক বছর ধরেই জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। জিও ব্যাগ ফেলার কারণে অনেক পয়েন্টে এখন ভাঙন রোধ করা গেছে বলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে দাবি করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা) ঝিনাইদ-এর প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, গড়াই নদীর ভাঙন কেবল এবছরই শুরু হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। গত এক দশক ধরেই এই ভাঙন চলে আসছে। শৈলকূপার কয়েকটি গ্রামের মৌজাভুক্ত জমি এরই মধ্যে নদীর গর্ভে চলে গেছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এমনটি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভাঙন রোধে আমরা অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছিলাম। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে একটি প্রকল্প চালু ও এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কাজ শুরুর অনুমোদন পেয়েছি। সম্ভাব্যতা যাচাইও শেষ পর্যায়ে। আশা করছি, আগামী শীত মৌসুমে আমরা ভাঙন কবলিত এলাকায় স্থায়ী বা টেকসই ব্লকের বাঁধ বসানোর কাজ শুরু করতে পারবো।
এম শাহাজান/এনএইচআর/এএসএম

Leave a Reply