সংকট আর অচল যন্ত্রে ধুঁকছে মৌলভীবাজারের চিকিৎসাসেবা
জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে মৌলভীবাজারের ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা চলছে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছেন প্রায় ৫০০ রোগী। অথচ ৮৪ চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। চিকিৎসকের পাশাপাশি টেকনোলজিস্ট, নার্স ও শয্যার সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ৪০৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১০৩টি শূন্য থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ৮৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও ৭ জন সিনিয়র কনসালটেন্টসহ অনুপস্থিত ৪২ জন চিকিৎসক। রয়েছে টেকনোলজিস্ট ও নার্স সংকট, শয্যার স্বল্পতা এবং অব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক থাকায় বহির্বিভাগে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় চিকিৎসকের দেখা মিলছে না বলে অভিযোগ রোগীদের।
‘আমাদের এই হাসপাতাল ২৫০ শয্যা, ফলে এখানে সংকট স্বাভাবিক। আমরা প্রতিটা সমস্যা সুন্দরভাবে সমাধানের জন্য কাজ করছি। একইসঙ্গে বিষয়গুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি।’
শুধু চিকিৎসক নয়, জনবল সংকট রয়েছে ল্যাব ও এক্স-রে বিভাগেও। ১৪ জন টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে সীমিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবাও।
আরও পড়ুন
৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বদলে যাবে রাজশাহীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা
এছাড়া প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সংকটের পাশাপাশি সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুইদিন সিটিস্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ। অচল হয়ে আছে সিসিইউ ও আইসিইউ। সংকট রয়েছে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যেরও। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ শত রোগী ভর্তি থাকেন। এসব রোগীর চিকিৎসা সেবা পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জেলার সচেতন নাগরিকেরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি মেডিকেল কলেজের দাবি জানাচ্ছেন। তবে এটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মেডিকেল কলেজ হলে অনেক সমস্যা সমাধান হবে। নয়তো এই জেলার মানুষের সারাজীবন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে বাস্তবে প্রকৃত কোনো চিকিৎসা নেই। এখানে যে চিকিৎসা হয় তা প্রাথমিক চিকিৎসা। এক শতাংশ জটিল কোনো রোগ হলে সিলেট রেফার্ড করা হয়। চিকিৎসার অভাবে শতশত গরীব মানুষ মারা যাচ্ছে অথচ তা কেউ হিসেবে আনছে না।
‘হাসপাতালে অনেক সমস্যা আছে। এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারবো না। কারণ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব বোর্ড আছে।’
সরেজমিনে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তির জন্য আসেন। ফলে শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকেই মেঝে কিংবা বারান্দায় গাদাগাদি করে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগী ও স্বজনদের চাপে টয়লেটসহ সর্বত্র অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। অভ্যন্তরীণ রোগ নির্ণয় ও ল্যাব পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে দালাল চক্র। হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুরবস্থাও বাড়াচ্ছে রোগীদের ভোগান্তি। বিভিন্ন স্থানে ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পানি প্রবেশ করে হাসপাতালের ভেতর। ডায়ালাইসিসের জন্য ২০০ জন রোগী অপেক্ষাকৃত আছেন। অনেক ডায়ালাইসিসের রোগী চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করছেন।
আরও পড়ুন
বনদস্যুদের নৌকা প্রতি লাখ টাকা দিয়ে সুন্দরবনে ঢুকতে হচ্ছে জেলেদের
হাসপাতালে আগত রোগী ও স্বজনেরা জানান, একদিকে চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টের সংকট, অন্যদিকে অচল গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ মিলছে। সবমিলিয়ে জেলার প্রধান এই হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো রোগী। ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতালের এমন সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তারা।
হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা পারুল বেগম বলেন, মেডিসিনের অভাবে ব্লাড টেস্ট করা হয়নি আমার। এই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই। সামান্য কিছু হলেই সিলেট রেফার্ড করা হয়। আমরা চিকিৎসা সেবা থেকে চরম বঞ্চিত হচ্ছি। টাকা দিয়েও ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি না।
আলতা মিয়া নামে একজন কিডনি রোগী বলেন, ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেছিলাম তবে এখানে শিডিউল পাইনি। জেলার একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এখানে এমআরআই, সিসিইউ, আইসিইউ সেবা একেবারে নেই।
আরও পড়ুন
রাজশাহীর পদ্মায় ১০ বছরে দুই শতাধিক মৃত্যু, নেপথ্যে কী?
রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া বলেন, আমার শাশুড়িকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে ছিলাম। তার আলট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই সেবা এসে বন্ধ পেয়েছি। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
‘ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেছিলাম তবে এখানে শিডিউল পাইনি। জেলার একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এখানে এমআরআই, সিসিইউ, আইসিইউ সেবা একেবারে নেই।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাসপাতালে অনেক সমস্যা আছে। এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারবো না। কারণ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব বোর্ড আছে।
মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, আমাদের এই হাসপাতাল ২৫০ শয্যা, ফলে এখানে সংকট স্বাভাবিক। আমরা প্রতিটা সমস্যা সুন্দরভাবে সমাধানের জন্য কাজ করছি। একইসঙ্গে বিষয়গুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। জনবল সংকট নিয়ে এসব রোগীর চাপ সামাল দেওয়া অনেক কঠিন।
এনএইচআর