দৌড়েই স্বপ্নজয়, সুইটি আক্তারের ৮০ ম্যারাথন নারীদের অনুপ্রেরণা

0
দৌড়েই স্বপ্নজয়, সুইটি আক্তারের ৮০ ম্যারাথন নারীদের অনুপ্রেরণা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই দিনের শুরু। শহরের ব্যস্ততা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু সুইটি আক্তারের দিনের প্রথম কাজ দৌড়ের প্রস্তুতি নেওয়া। কারো কাছে এটি ব্যায়াম, কারো কাছে শখ; কিন্তু সুইটির কাছে ম্যারাথন মানে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা আর নিজের সীমা অতিক্রম করার এক নিরন্তর সাধনা। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ আর্মি স্টাফ কলেজের সুইমিং কোচ এবং একজন নিবেদিতপ্রাণ ম্যারাথন রানার-এই তিন পরিচয়কে সমান দক্ষতায় ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
সুইটি আক্তার, যিনি সুইটি কবির নামেও পরিচিত, ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহী। অ্যাথলেটিক্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হতে একসময় ম্যারাথনের প্রেমে পড়েন। নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো, সুস্থ জীবনযাপন এবং প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষাই তাকে এই দীর্ঘ পথের যাত্রী করেছে। নিয়মিত অনুশীলন, কোচের দিকনির্দেশনা এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন তার পথচলাকে করেছে আরও দৃঢ়।
আজ পর্যন্ত তিনি দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ৮০টিরও বেশি রানিং ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। তার অংশগ্রহণের তালিকায় রয়েছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ম্যারাথন, বাংলাদেশ পুলিশ আয়োজিত জয় বাংলা ম্যারাথন, জলসিঁড়ি ম্যারাথনসহ আরও অনেক প্রতিযোগিতা। ব্যস্ত কর্মজীবন ও পড়াশোনার পাশাপাশি সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খেলাধুলা ও শিক্ষা দুই ক্ষেত্রেই তিনি সমান মনোযোগ ধরে রেখেছেন। তার বিশ্বাস, পরিকল্পিত জীবনযাপন করলে কোনো স্বপ্নই অধরা থাকে না।
দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও মাঠের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিকেএসপি সার্টিফাইড অ্যাথলেটিক্স কোচ হয়েছেন। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক কোচিং পদ্ধতি, সঠিক রানিং টেকনিক, ওয়ার্ম-আপ, কুল-ডাউন, ইনজুরি প্রতিরোধ এবং পারফরম্যান্স উন্নয়নের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি নতুন ও অভিজ্ঞ রানারদের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং লক্ষ্য অনুযায়ী আলাদা প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করে দেন। পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস, ফিটনেস ও জীবনযাপন নিয়েও পরামর্শ দেন।

আরও পড়ুন

প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারের ফাঁদে পড়ে রেজিনা, অতঃপর..

একজন নারী হিসেবে এই পথ খুব সহজ ছিল না। নিয়মিত অনুশীলনের জন্য সময় বের করা, পারিবারিক দায়িত্ব সামলানো, নিরাপদ পরিবেশে অনুশীলন করা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে শারীরিক ও মানসিক চাপ মোকাবিলা সবই ছিল তার পথচলার অংশ। ইনজুরির ঝুঁকি এবং পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে অনুশীলনের সময় মিলিয়ে নেওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি মনে করেন, ধৈর্য, পরিকল্পনা, পরিবারের সমর্থন এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
সুইটির সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার স্বামী, যিনি নিজেও একজন নিয়মিত অ্যাথলেট ও ম্যারাথন রানার। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় তিনি পাশে থেকেছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। পাশাপাশি তার শিক্ষক ও কোচ ওহাব খান, মা, পরিবারের সদস্য এবং স্টার রানার্স ক্লাব বিডি-এর সদস্যদের সহযোগিতাকেও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বিভিন্ন ম্যারাথন ও স্বল্প দূরত্বের দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি একাধিকবার পোডিয়াম অর্জন করেছেন। পেয়েছেন অসংখ্য মেডেল, সার্টিফিকেট ও সম্মাননা। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন দুটি বিকেএসপি সার্টিফাইড অ্যাথলেটিক্স কোচ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথনে পোডিয়াম অর্জন। তার ভাষায়, এই দুটি অর্জন কেবল পুরস্কার নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি।
ম্যারাথনের শারীরিক সুফল সম্পর্কেও তিনি আশাবাদী। তার মতে, নিয়মিত দৌড় হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে, সহনশীলতা বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মানসিক চাপ কমায় এবং আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলে। নতুনদের উদ্দেশে তার পরামর্শ প্রথমে হাঁটা দিয়ে শুরু করুন, এরপর ধীরে ধীরে ছোট দূরত্বে দৌড়ান। সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং উপযুক্ত রানিং জুতা ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে অভিজ্ঞ কোচের পরামর্শ নিয়ে ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নিন।

আরও পড়ুন

মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে?

ভবিষ্যতে আরও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একজন বিকেএসপি সার্টিফাইড অ্যাথলেটিক্স কোচ হিসেবে নতুন প্রজন্মের অ্যাথলেট গড়ে তুলতে চান সুইটি আক্তার। বিশেষ করে নারীদের খেলাধুলায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে এবং সুস্থ জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় জয় গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং প্রতিদিন নিজের সীমাকে একটু একটু করে অতিক্রম করার সাহস অর্জন করা।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
কেএসকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *