নির্বাচনী বিরোধ ও রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে এনসিপি-জামায়াত সম্পর্কে টানাপোড়েন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মনোনয়ন এবং সমসাময়িক বেশ কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে মতভেদের কারণে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের মধ্যে টানা পোড়েন দেখা দিয়েছে। এতে করে দুই দলের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

গত ৩১ অক্টোবর জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম উপস্থিত না থাকায় জোট ভাঙার জল্পনা আরও তীব্র হয়। তবে উভয় দলের শীর্ষ নেতারা সম্ভাব্য এই ভাঙনের কথা অস্বীকার করেছেন।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধ

এনসিপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে না গিয়ে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত, সেখান থেকেই মূল বিরোধের সূত্রপাত। বিশেষ করে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের একটিতেও এনসিপি প্রার্থীদের জন্য ছাড় দিতে জামায়াতের অস্বীকৃতিতে অসন্তোষ তৈরি হয়।

গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে দুই দলের বৈঠকে এনসিপি ঢাকার যেকোনো একটি সিটি করপোরেশন দাবি করেছিল। কিন্তু জামায়াত তা সরাসরি নাকচ করে দেয়। পরবর্তীতে জামায়াত ঢাকা উত্তরের জন্য সাবেক শিবির সভাপতি সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির জন্য ডাকসুর সাবেক সহ-সভাপতি আবু শাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে মাঠপর্যায়ে প্রচারণা শুরু করে।

জামায়াত থেকে এনসিপিকে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও এনসিপি তা গ্রহণ করেনি। এর জবাবে এনসিপি ঢাকা দক্ষিণে তাদের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী এবং ঢাকা উত্তরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ও জাতীয় ইস্যুতে অসন্তোষ

নির্বাচনী আসন ছাড়াও গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর কাছ থেকে মিষ্টি ও ফুলের তোড়া গ্রহণ করায় জামায়াতের পরাজিত প্রার্থীর আচরণের সমালোচনা করেছে এনসিপি। একই সঙ্গে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে জামায়াত জোরালো ভূমিকা না রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ৩০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগ ও খুলনায় পৃথক বক্তব্য প্রদানকালে এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আবদুল্লাহ জামায়াতের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। পাশাপাশি, সংসদে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জামায়াত আমীরের বক্তব্য এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের নীরব অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে দলটির অপ্রকাশ্য সমঝোতার সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলেও এনসিপির ভেতরের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে।

জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক মাওলানা হাসান জুনাইদ জানান, ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে সখ্যতা প্রদর্শন এবং নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে জামায়াতের নরম সুর শরিকদের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জোট ভাঙার জল্পনা উড়িয়ে দিলেন নেতারা

তবে জোট ভেঙে যাওয়ার খবরগুলোকে নিছকই গুঞ্জন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। ১ নভেম্বর ঢাকায় ‘জাতীয় যুব শক্তি’র এক অনুষ্ঠানে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী জানান, ১১ দলীয় জোটে কোনো বিভেদ নেই। শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যস্ততার কারণে আগের অনেক কর্মসূচিতে বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা অনুপস্থিত ছিলেন, তাই এটি কোনো বড় বিষয় নয়।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মহাবুল আলমও জানান, কৌশলগত কিছু বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও এনসিপির জোট ছাড়ার তথ্যটি সঠিক নয়। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে জোটের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান, রাজনৈতিক জোটে মতামত ও কৌশলে ভিন্নতা থাকতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দল আলাদা লড়ার নীতিতে জামায়াত অটল, কারণ কোনো একটি দলকে বিশেষ ছাড় দিলে অন্যান্য শরিকরাও একই দাবি তুলবে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, এনসিপির সঙ্গে এই মতপার্থক্য জোটের স্থায়িত্বে কোনো বড় সংকট তৈরি করবে না।

Views: 0