বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে একক কারখানার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এই শিল্পের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা।
চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে আয়োজিত ‘র্যাপিড এনার্জি ট্রানজিশন কনফারেন্স: পাওয়ারিং সিকিউরিটি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড গ্রোথ ইন বাংলাদেশ আরএমজি’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির যৌথ আয়োজন করে এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশ। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পর চট্টগ্রামে এই তৃতীয় সংস্করণটি আয়োজন করা হয়।
সম্মেলনে মোট ৮৫ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। যার মধ্যে ৭০ জন কারখানা প্রতিনিধি, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর চট্টগ্রামের ৮ জন নেতা, ১ জন শ্রমিক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নবায়নযোগ্য শক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
বিশ্ববাজারে টিকে থাকার তাগিদ
অনুষ্ঠানে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণের নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএর পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি এবং এইচকে টিজি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল আজিজ চৌধুরী জানান, জ্বালানি সংকট আমাদের আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, “নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণ ও কার্বন কমানো এখন আর নিছক করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়। এটি বিশ্ববাজারে আমাদের টিকে থাকার মূল শর্তে পরিণত হয়েছে।” স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি সহায়তা, সহজ সবুজ অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
একই মতামত প্রকাশ করে বিকেএমইএর পরিচালক এবং সনেট গ্রুপ অব কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াসিন বলেন, “সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য জরুরি চাহিদা।” তিনি এলডিসি উত্তরণের আগেই কারখানায় জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার তাগিদ দেন।
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল ও যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সম্মেলনের আলোচনাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি করার পরও তা আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। ফলে কারখানার বাইরের উৎস থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি সংগ্রহ, জাতীয় গ্রিডকে কার্বনমুক্ত করা এবং অতিরিক্ত উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ বিক্রিতে উপযুক্ত প্রণোদনার দরকার।
বিজিএমইএর অতিরিক্ত সচিব (অব.) লে. কমান্ডার মো. কুতুবউদ্দিন চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) অব্যবহৃত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, বিকেএমইএর সিনিয়র যুগ্ম সচিব এবং চট্টগ্রাম শ্রম আদালতের সদস্য মো. আলতাফ উদ্দিন রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক খাতের সমন্বিত নিরাপত্তার উদাহরণ টেনে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও একইভাবে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শ্রমিক স্বার্থ ও বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা
ওয়ার্কার-লেড ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ওয়ার্কার ক্যান) আহ্বায়ক এবং বিএনটিইউএফের যুব কমিটির সভাপতি মো. হাসান আলী বলেন, “সবুজ রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের যুক্ত করলে এই শিল্প আরও টেকসই হবে। পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা জরুরি।”
এলসিবি ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেডের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ব্যবস্থাপক দৌলত হোসেন বলেন, প্রতিটি কারখানার আর্থিক ও পরিচালন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবসম্মত এবং সাশ্রয়ী এনার্জি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
ইটিআই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম, এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, শিল্পের পরিবর্তনের জন্য বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন।
অর্থায়ন ও প্রযুক্তির প্রয়োগ
সম্মেলনের দুটি কর্ম অধিবেশনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব, পরিবেশগত সুফল এবং অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন ইটিআই বাংলাদেশের জান্নাতুল ফেরদৌস, ক্লিন-এর সাদিয়া রওশন আধরা এবং প্যাসিফিক জিন্সের এজিএম তাহজিবুল হক।
দ্বিতীয় অধিবেশনে সবুজ অর্থায়নের সুবিধা তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির সাইফুল এ চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির গুলতেকিন বিনতে আজাদ। এ ছাড়া গ্রিন অ্যান্ড গ্রিনার গার্মেন্টসের (জিজিআই) সিইও নূরে আলম তৃতীয় পক্ষের অর্থায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে কথা বলেন।

