বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ কেবল একক কারখানার প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। চলমান জ্বালানি সংকট কাটিয়ে বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজন একটি সমন্বিত যৌথ উদ্যোগ। চট্টগ্রামে আয়োজিত এক সম্মেলনে এমন তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর শীর্ষ নেতারা।
সোমবার চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশ আয়োজিত ‘র্যাপিড এনার্জি ট্রানজিশন কনফারেন্স: পাওয়ারিং সিকিউরিটি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড গ্রোথ ইন বাংলাদেশ আরএমজি’ শীর্ষক সম্মেলনের তৃতীয় সংস্করণে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সফল আয়োজনের পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৈরি পোশাক খাতের জ্বালানি রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে কারখানার প্রতিনিধি, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতা, শ্রমিক প্রতিনিধি, পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ মোট ৮৫ জন অংশ নেন।
একক প্রচেষ্টা নয়, চাই সুদূরপ্রসারী যৌথ পদক্ষেপ
সম্মেলনে শিল্প প্রতিনিধিরা জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের টেকসই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং কার্বন নির্গমন কমানোর বিষয়ে কারখানাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির অপর্যাপ্ততার কারণে এই রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি এবং এইচকে টিজি গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল আজিজ চৌধুরী বলেন, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। “নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন হ্রাসকরণ এখন আর নিছক করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) বা পরিবেশগত আলোচনার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য এটি এখন আমাদের শিল্প খাতের অস্তিত্বের লড়াই,” বলে মন্তব্য করেন তিনি। এলডিসি উত্তরণ এবং বৈশ্বিক বাজারের কঠোর নীতিমালার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সরকারের সহায়তা, সবুজ অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিকেএমইএর পরিচালক ও সনেট গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াসিন বলেন, “সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর এখন আর কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, এটি শিল্পের টিকে থাকার বৈশ্বিক প্রয়োজন।” তিনি কারখানাগুলোকে এলডিসি উত্তরণের আগেই এনার্জি ইফিসিয়েন্সি বাড়ানো ও নতুন জ্বালানি নীতি অনুসরণের আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামের সম্ভাবনা ও শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তায় যেভাবে যৌথ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, একই ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতেও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন বিকেএমইএর সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক (প্রশাসন) মো. আলতাফ উদ্দিন।
বিজিএমইএর অতিরিক্ত সচিব লেফট্যানেন্ট কমাণ্ডার (অব.) মো. কুতুবউদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে যেসব অব্যবহৃত জমি রয়েছে, তা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা ও সমন্বিত রূপান্তর
ওয়ার্কার-লেড ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ওয়ার্কার ক্যান) আহ্বায়ক এবং বিএনটিইউএফ-এর যুব কমিটির সভাপতি মো. হাসান আলী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের এই যাত্রায় শ্রমিকদের অধিকার, কর্মসংস্থান ও জীবিকার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারখানা মালিকরা শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নকে যুক্ত করলে টেকসই শিল্প গঠনে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
এলসিবি ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেডের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার দৌলত হোসেন জানান, কারখানার বাস্তব সক্ষমতা এবং আর্থিক পরিস্থিতির আলোকেই জ্বালানি রূপান্তরের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ইটিআই বাংলাদেশের প্রোগ্রাম পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং পুরো শিল্পে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।
সবুজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সমাধান
সম্মেলনের কারিগরি সেশনে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও জ্বালানি সংকটের চিত্র তুলে ধরেন ইটিআই বাংলাদেশের গবেষণা কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস। সৌরবিদ্যুতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরেন ‘ক্লিন’-এর সাদীয়া রওশন অধরা। প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং) তাহজিবুল হক নিজ কারখানায় নবায়নযোগ্য শক্তির সফল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
সবুজ অর্থায়ন ও পুনর্বিনয়োগ সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেন ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির সাইফুল এ চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির গুলতেকিন বিনতে আজাদ। গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভের (জিজিআই) প্রধান নির্বাহী নূরে আলম প্রযুক্তিগত ও অর্থায়নের নানা বিকল্প তুলে ধরেন।
সম্মেলন থেকে নীতিগত বাধা দূর করা, চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে সৌরবিদ্যুতের সম্মিলিত অবকাঠামো তৈরি, গ্রিডের ডিকার্বোনাইজেশন এবং কারখানাভিত্তিক এনার্জি রোডম্যাপ প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
