ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের অস্পষ্ট ফলাফলের পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে। দেশটি যখন তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মুখোমুখি, তখন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছেন। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নাকি তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা। তবে প্রেসিডেন্টের সমঝোতার আহ্বানের পরও নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেছেন নেতানিয়াহু।
প্রেসিডেন্টের সমঝোতার তাগিদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
১২০ আসনের নেসেটে (পার্লামেন্ট) কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ দলগুলোকে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব নয় এবং নতুন নির্বাচন এড়াতে দলগুলোর মধ্যে সৃজনশীলতা, সাহস ও সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন।
ইসরায়েলের প্রায় ২০ শতাংশ অংশজুড়ে থাকা আরব সংখ্যালঘুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট হারজগ সম্প্রতি শোনা যাওয়া বর্ণবাদী মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠে দেশকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
আইজেনকোটের মার্কিন সম্পর্ক জোরদার ও আরব দলের সমর্থন
সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট ইতোমধ্যেই প্রধান আরব-ইসরায়েলি দল ‘রাম’ (Raam)-এর আনুষ্ঠানিক সমর্থন পেয়েছেন। তিনি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করবেন।
আইজেনকোট সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা যেন নেতানিয়াহু না করেন। এদিকে, মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পর বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি আরও জোরদার করেছে। বামপন্থী জোট নেতা ইয়ার গোলান সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহু ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির ক্ষমতায় থাকলে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ও পাল্টা বিতর্ক
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করতে বিদেশি রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। বিশেষ করে আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর বিরুদ্ধে তিনি কড়া অবস্থান নিয়েছেন, যাদের সমর্থনে আইজেনকোট সরকার গঠন করতে পারেন। কাতার থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও, নেতানিয়াহুর নিজস্ব সহযোগীদের বিরুদ্ধেও অতীতে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।
অন্যদিকে, চরমপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আরব নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। আরব আইনপ্রণেতা আয়মান ওদেহের বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থ গ্রহণের অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও, আরবদের বৃহত্তম জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ একে রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে অভিহিত করেছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও পরবর্তী ধাপ
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ৯,০৬৯টি পোলিং স্টেশন নিরীক্ষা করার পর জানিয়েছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৫ সদস্যের সমর্থনে এবং ২ সদস্যের বিপক্ষে ভোট দিয়ে কমিশন ফলাফলের অনুমোদন দিয়েছে, যদিও ১৪ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হারজগ দুই দিনের প্রাথমিক পরামর্শ পর্ব শেষ করে যেকোনো এক নেতাকে সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেবেন। প্রয়োজনবোধে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।


