ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝতায় আসার আহ্বান জানালেও, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ২৭ অক্টোবরের এই ভোটে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এর প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ পার্লামেন্টের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছেন। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নাকি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে আগে সরকার গঠনের সুযোগ দেবেন, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
সমঝতা ও নতুন চিন্তার তাগিদ
রাজনৈতিক অচলবস্থার মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানিয়েছেন, বর্তমান বাস্তবতায় কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয় পায়নি। তাই নতুন নির্বাচন এড়াতে উভয় পক্ষকেই আপস ও সমঝতার মানসিকতা দেখাতে হবে। তিনি বলেন, “ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বিজয়ী করতে আমি উভয় পক্ষের কাছ থেকে সৃজনশীলতা, সাহস ও সদিচ্ছার আহ্বান জানাচ্ছি।”
নির্বাচনে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী আরব সংখ্যালঘুদের জোটগুলোর প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো নেতার নাম উল্লেখ না করে প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানান, তিনি আরব সংখ্যালঘুদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন এবং সম্প্রতি শোনা বিভিন্ন বর্ণবাদী ও অশালীন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান।
নেতানিয়াহুর বিদেশী হস্তক্ষেপের দাবি
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে কয়েকটি বিদেশী রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে বলে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনের দিন নগদ অর্থসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা তুলে ধরে তিনি আরব-প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আরব নেতারা কাতার থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন—যে অভিযোগটি নেতানিয়াহুর নিজস্ব সহযোগীদের বিরুদ্ধেও আগে উঠেছে।
তবে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ৯,০৬৯টি ভোটকেন্দ্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছে, ফলাফলের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৫ জন সদস্যের সমর্থনে এই ফলাফল অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভীর এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আরব নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। মিডিয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আরব আইনপ্রণেতা আইমান ওদেহের বিরুদ্ধে বিদেশী অর্থ গ্রহণের অভিযোগে তদন্ত চলছে, যাকে তার দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’ রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে আখ্যা দিয়েছে।
আইজেনকোটের ভূমিকা ও মার্কিন সম্পর্ক
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ইতোমধ্যে একটি বড় আরব দল ‘রাম’ (Raam)-এর সমর্থন পেয়েছেন। তিনি নতুন সরকার গঠন করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বি-পাক্ষিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সম্প্রতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সমঝোতার খবরের পর এই মন্তব্য এলো।
আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার গোলান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু ও ইতামার বেন গভীরের দীর্ঘস্থায়ী শাসন ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট হারজোগ প্রাথমিক আলোচনা শেষে মনোনীত কোনো প্রতিনিধিকে সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিনের সময় দেবেন, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।


